Shuvashis Biswas logoShuvashis BiswasArchitect · Civil Engineer

Literature / Poems

Famous poems

Full poems by world-famous poets, each with a Bangla translation — and Tagore and Nazrul in the original Bangla.
বিশ্বখ্যাত কবিদের পূর্ণ কবিতা, সঙ্গে বাংলা অনুবাদ; রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের কবিতা মূল বাংলায়।

01

William Shakespeare

1564–1616 · England

01Sonnet 181609

English

Shall I compare thee to a summer’s day?
Thou art more lovely and more temperate:
Rough winds do shake the darling buds of May,
And summer’s lease hath all too short a date;
Sometime too hot the eye of heaven shines,
And often is his gold complexion dimm’d;
And every fair from fair sometime declines,
By chance or nature’s changing course untrimm’d;
But thy eternal summer shall not fade,
Nor lose possession of that fair thou ow’st;
Nor shall Death brag thou wander’st in his shade,
When in eternal lines to time thou grow’st:
So long as men can breathe or eyes can see,
So long lives this, and this gives life to thee.

বাংলা অনুবাদ

তোমায় কি তুলনা করব এক গ্রীষ্মদিনের সাথে?
তুমি যে তার চেয়েও সুন্দর, আরও কোমল, আরও স্নিগ্ধ:
দমকা হাওয়া কাঁপিয়ে দেয় মে মাসের প্রিয় কুঁড়িগুলো,
আর গ্রীষ্মের মেয়াদ বড্ড অল্প দিনের;
কখনো আকাশের চোখ—সূর্য—বড় বেশি তপ্ত হয়ে জ্বলে,
প্রায়ই আবার মলিন হয় তার সোনালি মুখ;
প্রতিটি সুন্দরই একদিন সৌন্দর্য হারায়,
দৈবে কিংবা প্রকৃতির বদলে যাওয়া ধারায়।
কিন্তু তোমার চিরন্তন গ্রীষ্ম কখনো ম্লান হবে না,
হারাবে না তোমার নিজস্ব সেই সৌন্দর্য;
মৃত্যুও গর্ব করতে পারবে না যে তুমি তার ছায়ায় ঘুরে বেড়াও,
যখন চিরকালের পঙ্ক্তিতে তুমি সময়ের সঙ্গে বেড়ে উঠবে:
যতদিন মানুষ শ্বাস নেবে, যতদিন চোখ দেখবে,
ততদিন বেঁচে থাকবে এই কবিতা, আর এ-ই তোমাকে দেবে জীবন।

02Sonnet 291609

English

When, in disgrace with fortune and men’s eyes,
I all alone beweep my outcast state,
And trouble deaf heaven with my bootless cries,
And look upon myself and curse my fate,
Wishing me like to one more rich in hope,
Featured like him, like him with friends possessed,
Desiring this man’s art and that man’s scope,
With what I most enjoy contented least;
Yet in these thoughts myself almost despising,
Haply I think on thee, and then my state,
Like to the lark at break of day arising
From sullen earth, sings hymns at heaven’s gate;
For thy sweet love remembered such wealth brings
That then I scorn to change my state with kings.

বাংলা অনুবাদ

যখন ভাগ্য আর মানুষের চোখে আমি অপমানিত,
একা একা কাঁদি আমার পরিত্যক্ত দশা নিয়ে,
বধির স্বর্গকে বিরক্ত করি নিষ্ফল আর্তনাদে,
নিজের দিকে তাকাই আর অভিশাপ দিই ভাগ্যকে,
ইচ্ছে করে হই আরও আশায় ভরা কারও মতো,
তার মতো রূপ, তার মতো বন্ধুতে ঘেরা,
কামনা করি এর প্রতিভা, ওর বিস্তার,
যা আমি সবচেয়ে উপভোগ করি, তাতেই সবচেয়ে কম তৃপ্ত;
তবু এই ভাবনায় যখন নিজেকে প্রায় ঘৃণা করছি,
হঠাৎ তোমার কথা মনে পড়ে, আর তখন আমার অন্তর,
ভোরবেলা বিষণ্ণ মাটি ছেড়ে উড়ে ওঠা
ভরতপাখির মতো, স্বর্গের দুয়ারে গান গায়;
কারণ তোমার মধুর ভালোবাসার স্মৃতি এমন ঐশ্বর্য আনে
যে তখন রাজাদের সঙ্গেও আমি আমার দশা বদলাতে চাই না।

03Sonnet 731609

English

That time of year thou mayst in me behold
When yellow leaves, or none, or few, do hang
Upon those boughs which shake against the cold,
Bare ruined choirs, where late the sweet birds sang.
In me thou see’st the twilight of such day
As after sunset fadeth in the west,
Which by and by black night doth take away,
Death’s second self, that seals up all in rest.
In me thou see’st the glowing of such fire
That on the ashes of his youth doth lie,
As the death-bed whereon it must expire,
Consumed with that which it was nourished by.
This thou perceiv’st, which makes thy love more strong,
To love that well which thou must leave ere long.

বাংলা অনুবাদ

বছরের সেই সময়টা তুমি আমার মধ্যে দেখতে পাও
যখন হলুদ পাতা—কয়েকটি, কিংবা একটিও না—ঝুলে থাকে
সেই সব ডালে, যারা শীতের মুখে কাঁপে,
শূন্য, ভাঙা গানের মঞ্চ, যেখানে সম্প্রতি মিষ্টি পাখিরা গাইত।
আমার মধ্যে তুমি দেখো সেই দিনের গোধূলি
যা সূর্যাস্তের পর পশ্চিমে মিলিয়ে যায়,
যাকে একটু একটু করে কালো রাত্রি নিয়ে যায়,
মৃত্যুর দ্বিতীয় রূপ, যে সব কিছুকে বিশ্রামে মুড়ে দেয়।
আমার মধ্যে তুমি দেখো এমন আগুনের আভা
যা তার যৌবনের ছাইয়ের ওপর শুয়ে আছে,
যেন মৃত্যুশয্যা, যেখানে তাকে নিভে যেতেই হবে,
যা তাকে পুষেছিল, তাতেই সে ক্ষয়ে যায়।
এ তুমি বোঝো, আর তাই তোমার ভালোবাসা আরও দৃঢ় হয়—
যাকে অচিরেই ছেড়ে যেতে হবে, তাকে আরও গভীরভাবে ভালোবাসতে।

04Sonnet 1161609

English

Let me not to the marriage of true minds
Admit impediments. Love is not love
Which alters when it alteration finds,
Or bends with the remover to remove.
O no! it is an ever-fixed mark
That looks on tempests and is never shaken;
It is the star to every wand’ring bark,
Whose worth’s unknown, although his height be taken.
Love’s not Time’s fool, though rosy lips and cheeks
Within his bending sickle’s compass come;
Love alters not with his brief hours and weeks,
But bears it out even to the edge of doom.
If this be error and upon me proved,
I never writ, nor no man ever loved.

বাংলা অনুবাদ

সত্য দুটি মনের মিলনে আমি
কোনো বাধা মানি না। সে ভালোবাসা ভালোবাসাই নয়
যা বদল দেখলেই নিজে বদলে যায়,
কিংবা কেউ সরে গেলে নিজেও সরে যায়।
না, না! সে এক চিরস্থির চিহ্ন,
যে ঝড়ের দিকে চেয়ে থাকে, তবু কখনো কাঁপে না;
সে প্রতিটি পথহারা তরীর ধ্রুবতারা,
যার উচ্চতা মাপা যায়, কিন্তু মূল্য অজানা।
ভালোবাসা সময়ের ক্রীড়নক নয়, যদিও গোলাপি ঠোঁট আর গাল
তার বাঁকা কাস্তের নাগালে এসে পড়ে;
ভালোবাসা বদলায় না তার ক্ষণিক ঘণ্টা আর সপ্তাহে,
বরং টিকে থাকে প্রলয়ের কিনারা পর্যন্ত।
এ যদি ভুল হয়, আর আমার বিরুদ্ধে প্রমাণিত হয়,
তবে আমি কখনো লিখিনি, আর কোনো মানুষ কখনো ভালোবাসেনি।

05Sonnet 1301609

English

My mistress’ eyes are nothing like the sun;
Coral is far more red than her lips’ red;
If snow be white, why then her breasts are dun;
If hairs be wires, black wires grow on her head.
I have seen roses damasked, red and white,
But no such roses see I in her cheeks;
And in some perfumes is there more delight
Than in the breath that from my mistress reeks.
I love to hear her speak, yet well I know
That music hath a far more pleasing sound;
I grant I never saw a goddess go;
My mistress, when she walks, treads on the ground.
And yet, by heaven, I think my love as rare
As any she belied with false compare.

বাংলা অনুবাদ

আমার প্রিয়ার চোখ মোটেই সূর্যের মতো নয়;
তার ঠোঁটের লালের চেয়ে প্রবাল ঢের বেশি লাল;
তুষার যদি সাদা হয়, তবে তার বুক তো ধূসর;
চুল যদি তার হয়, তবে তার মাথায় গজায় কালো তার।
আমি দেখেছি লাল-সাদা মেশানো গোলাপ,
কিন্তু তেমন গোলাপ তার গালে দেখি না;
আর কোনো কোনো সুগন্ধিতে আনন্দ বেশি
আমার প্রিয়ার নিঃশ্বাসের চেয়ে।
তার কথা শুনতে ভালোবাসি, তবু ভালোই জানি
সংগীতের সুর এর চেয়ে ঢের মধুর;
মানছি, আমি কখনো দেবীকে হাঁটতে দেখিনি;
আমার প্রিয়া হাঁটলে মাটিতেই পা ফেলে।
তবু, স্বর্গের নামে বলি, আমার ভালোবাসা ততটাই অনন্য
যতটা মিথ্যে উপমায় বাড়িয়ে বলা যে-কোনো নারী।

02

William Wordsworth

1770–1850 · England

01I Wandered Lonely as a Cloud1807, revised 1815

English

I wandered lonely as a cloud
That floats on high o’er vales and hills,
When all at once I saw a crowd,
A host, of golden daffodils;
Beside the lake, beneath the trees,
Fluttering and dancing in the breeze.

Continuous as the stars that shine
And twinkle on the milky way,
They stretched in never-ending line
Along the margin of a bay:
Ten thousand saw I at a glance,
Tossing their heads in sprightly dance.

The waves beside them danced; but they
Out-did the sparkling waves in glee:
A poet could not but be gay,
In such a jocund company:
I gazed—and gazed—but little thought
What wealth the show to me had brought:

For oft, when on my couch I lie
In vacant or in pensive mood,
They flash upon that inward eye
Which is the bliss of solitude;
And then my heart with pleasure fills,
And dances with the daffodils.

বাংলা অনুবাদ

মেঘের মতো একা একা ঘুরছিলাম আমি
যে মেঘ ভেসে বেড়ায় উপত্যকা আর পাহাড়ের ওপর দিয়ে,
হঠাৎ দেখি এক ভিড়,
সোনালি ড্যাফোডিলের এক বিশাল দল;
হ্রদের ধারে, গাছের নিচে,
হাওয়ায় দুলছে, নাচছে।

আকাশগঙ্গায় জ্বলজ্বল করা
ঝিকিমিকি তারার মতো অবিরাম,
তারা ছড়িয়ে ছিল অন্তহীন সারিতে
উপসাগরের কিনারা ধরে:
এক নজরে দেখলাম দশ হাজার,
প্রাণবন্ত নাচে মাথা দোলাচ্ছে।

পাশে ঢেউরাও নাচছিল; কিন্তু তারা
আনন্দে হার মানাল ঝলমলে ঢেউকেও:
এমন হাসিখুশি সঙ্গে
কবি কি আর প্রফুল্ল না হয়ে পারে:
আমি চেয়ে রইলাম—চেয়েই রইলাম—কিন্তু তখন বুঝিনি
এই দৃশ্য আমাকে কী সম্পদ দিয়ে গেল:

কারণ প্রায়ই, যখন শয্যায় শুয়ে থাকি
শূন্য কিংবা চিন্তামগ্ন মনে,
তারা ঝলকে ওঠে সেই অন্তর্চোখে
যা নির্জনতার পরম আনন্দ;
তখন আমার হৃদয় খুশিতে ভরে ওঠে,
আর ড্যাফোডিলের সাথে নাচে।

02Composed upon Westminster Bridge1802

English

Earth has not any thing to show more fair:
Dull would he be of soul who could pass by
A sight so touching in its majesty:
This City now doth, like a garment, wear
The beauty of the morning; silent, bare,
Ships, towers, domes, theatres, and temples lie
Open unto the fields, and to the sky;
All bright and glittering in the smokeless air.
Never did sun more beautifully steep
In his first splendour, valley, rock, or hill;
Ne’er saw I, never felt, a calm so deep!
The river glideth at his own sweet will:
Dear God! the very houses seem asleep;
And all that mighty heart is lying still!

বাংলা অনুবাদ

পৃথিবীর এর চেয়ে সুন্দর কিছু দেখানোর নেই:
আত্মায় নিস্তেজ সে, যে পাশ কাটিয়ে যেতে পারে
এমন মর্মস্পর্শী মহিমার দৃশ্য:
এই নগরী এখন পোশাকের মতো পরে আছে
ভোরের সৌন্দর্য; নিঃশব্দ, অনাবৃত,
জাহাজ, মিনার, গম্বুজ, নাট্যশালা আর মন্দির শুয়ে আছে
মাঠ আর আকাশের দিকে খোলা;
ধোঁয়াহীন বাতাসে সব উজ্জ্বল, ঝলমলে।
সূর্য কখনো এত সুন্দর করে ভেজায়নি
তার প্রথম দীপ্তিতে উপত্যকা, পাথর বা পাহাড়;
এত গভীর প্রশান্তি আমি কখনো দেখিনি, অনুভবও করিনি!
নদী বয়ে চলেছে আপন মধুর খেয়ালে:
হে ঈশ্বর! বাড়িগুলোও যেন ঘুমিয়ে আছে;
আর সেই বিশাল হৃদয় পুরোপুরি স্থির হয়ে শুয়ে আছে!

03The World Is Too Much with Us1807

English

The world is too much with us; late and soon,
Getting and spending, we lay waste our powers;—
Little we see in Nature that is ours;
We have given our hearts away, a sordid boon!
This Sea that bares her bosom to the moon;
The winds that will be howling at all hours,
And are up-gathered now like sleeping flowers;
For this, for everything, we are out of tune;
It moves us not. Great God! I’d rather be
A Pagan suckled in a creed outworn;
So might I, standing on this pleasant lea,
Have glimpses that would make me less forlorn;
Have sight of Proteus coming from the sea;
Or hear old Triton blow his wreathed horn.

বাংলা অনুবাদ

পৃথিবী আমাদের বড় বেশি ঘিরে আছে; সকাল-সন্ধ্যা,
উপার্জন আর ব্যয়ে আমরা নষ্ট করি আমাদের শক্তি;—
প্রকৃতিতে আমাদের নিজের বলতে খুব কমই দেখি;
আমরা হৃদয় বিলিয়ে দিয়েছি—কী তুচ্ছ বিনিময়!
এই সমুদ্র, যে চাঁদের কাছে তার বুক মেলে দেয়;
এই বাতাস, যে সারাক্ষণ গর্জন করে চলে,
আর এখন ঘুমন্ত ফুলের মতো গুটিয়ে আছে;
এর জন্য, সব কিছুর জন্য, আমরা সুর হারিয়েছি;
এসব আমাদের নাড়া দেয় না। হে মহান ঈশ্বর! বরং আমি হতাম
পুরোনো, লুপ্ত বিশ্বাসে লালিত এক পৌত্তলিক;
তাহলে এই মনোরম তৃণভূমিতে দাঁড়িয়ে
এমন কিছুর আভাস পেতাম যা আমাকে কম নিঃসঙ্গ করত;
দেখতাম সমুদ্র থেকে প্রোটিয়াসের উঠে আসা;
কিংবা শুনতাম বুড়ো ট্রাইটনের প্যাঁচানো শিঙার ধ্বনি।

04My Heart Leaps Up1807

English

My heart leaps up when I behold
A rainbow in the sky:
So was it when my life began;
So is it now I am a man;
So be it when I shall grow old,
Or let me die!
The Child is father of the Man;
And I could wish my days to be
Bound each to each by natural piety.

বাংলা অনুবাদ

আমার হৃদয় লাফিয়ে ওঠে যখন দেখি
আকাশে রংধনু:
তেমনই ছিল যখন জীবন শুরু হয়েছিল;
তেমনই আছে এখন, যখন আমি পূর্ণ মানুষ;
তেমনই যেন থাকে যখন বুড়ো হব,
নইলে আমার মৃত্যু হোক!
শিশুই মানুষের পিতা;
আর আমি চাই আমার দিনগুলো
একে অপরের সঙ্গে বাঁধা থাকুক প্রকৃতির প্রতি ভক্তিতে।

05She Dwelt among the Untrodden Ways1800

English

She dwelt among the untrodden ways
Beside the springs of Dove,
A Maid whom there were none to praise
And very few to love:

A violet by a mossy stone
Half hidden from the eye!
—Fair as a star, when only one
Is shining in the sky.

She lived unknown, and few could know
When Lucy ceased to be;
But she is in her grave, and, oh,
The difference to me!

বাংলা অনুবাদ

সে থাকত জনমানবহীন পথের ধারে
ডাভ নদীর ঝরনার পাশে,
এক কুমারী, যার প্রশংসা করার কেউ ছিল না
আর ভালোবাসার মানুষও ছিল খুব কম:

শ্যাওলা-ঢাকা পাথরের পাশে এক ভায়োলেট
চোখের আড়ালে আধো লুকোনো!
—তারার মতো সুন্দর, যখন একটিমাত্র তারা
জ্বলে আকাশে।

সে বেঁচেছিল অজানা, আর খুব কম লোকই জানল
কবে লুসি আর রইল না;
কিন্তু সে এখন কবরে, আর, হায়,
আমার কাছে কী বিশাল সেই শূন্যতা!

03

John Keats

1795–1821 · England

01Bright Starwritten 1819

English

Bright star, would I were stedfast as thou art—
Not in lone splendour hung aloft the night
And watching, with eternal lids apart,
Like nature’s patient, sleepless Eremite,
The moving waters at their priestlike task
Of pure ablution round earth’s human shores,
Or gazing on the new soft-fallen mask
Of snow upon the mountains and the moors—
No—yet still stedfast, still unchangeable,
Pillow’d upon my fair love’s ripening breast,
To feel for ever its soft fall and swell,
Awake for ever in a sweet unrest,
Still, still to hear her tender-taken breath,
And so live ever—or else swoon to death.

বাংলা অনুবাদ

উজ্জ্বল তারা, যদি তোমার মতো অবিচল হতে পারতাম—
তবে রাতের আকাশে একাকী দীপ্তিতে ঝুলে থেকে নয়,
চিরন্তন খোলা চোখে চেয়ে থেকে নয়,
প্রকৃতির ধৈর্যশীল, নিদ্রাহীন সন্ন্যাসীর মতো,
চলমান জলরাশির দিকে, যারা পুরোহিতের মতো
পৃথিবীর মানব-তীর ঘিরে পবিত্র স্নানের কাজ করে চলে,
কিংবা পাহাড় আর প্রান্তরের ওপর
সদ্য ঝরে পড়া কোমল তুষারের আবরণের দিকে চেয়ে—
না—তবু অবিচল, তবু অপরিবর্তনীয়,
আমার সুন্দর প্রিয়ার বুকে মাথা রেখে,
চিরকাল অনুভব করতে তার কোমল ওঠানামা,
চিরকাল জেগে থাকতে এক মধুর অস্থিরতায়,
অবিরাম শুনতে তার কোমল নিঃশ্বাস,
আর এভাবেই বেঁচে থাকতে চিরকাল—নয়তো মূর্ছিত হয়ে মৃত্যুতে।

02When I Have Fears That I May Cease to Bewritten 1818

English

When I have fears that I may cease to be
Before my pen has glean’d my teeming brain,
Before high-piled books, in charactery,
Hold like rich garners the full ripen’d grain;
When I behold, upon the night’s starr’d face,
Huge cloudy symbols of a high romance,
And think that I may never live to trace
Their shadows with the magic hand of chance;
And when I feel, fair creature of an hour,
That I shall never look upon thee more,
Never have relish in the faery power
Of unreflecting love—then on the shore
Of the wide world I stand alone, and think
Till love and fame to nothingness do sink.

বাংলা অনুবাদ

যখন ভয় হয়, হয়তো আমি থেমে যাব
আমার কলম আমার উর্বর মন থেকে সব কুড়িয়ে নেওয়ার আগেই,
অক্ষরে অক্ষরে স্তূপ করা বইগুলো
পাকা শস্যে ভরা গোলাঘরের মতো হয়ে ওঠার আগেই;
যখন রাতের তারাভরা মুখে দেখি
এক মহৎ রোমান্সের বিশাল মেঘময় প্রতীক,
আর ভাবি হয়তো আমি কখনো বেঁচে থাকব না
ভাগ্যের জাদুকরী হাতে তাদের ছায়া আঁকতে;
আর যখন অনুভব করি, হে এক মুহূর্তের সুন্দরী,
আমি আর কখনো তোমাকে দেখতে পাব না,
কখনো স্বাদ পাব না অবিবেচী ভালোবাসার
সেই পরীর জাদুর—তখন বিশাল পৃথিবীর
তীরে আমি একা দাঁড়িয়ে ভাবি,
যতক্ষণ না ভালোবাসা আর খ্যাতি শূন্যতায় তলিয়ে যায়।

03On First Looking into Chapman’s Homer1816

English

Much have I travell’d in the realms of gold,
And many goodly states and kingdoms seen;
Round many western islands have I been
Which bards in fealty to Apollo hold.
Oft of one wide expanse had I been told
That deep-brow’d Homer ruled as his demesne;
Yet did I never breathe its pure serene
Till I heard Chapman speak out loud and bold:
Then felt I like some watcher of the skies
When a new planet swims into his ken;
Or like stout Cortez when with eagle eyes
He star’d at the Pacific—and all his men
Look’d at each other with a wild surmise—
Silent, upon a peak in Darien.

বাংলা অনুবাদ

সোনার রাজ্যে আমি বহু ঘুরেছি,
দেখেছি অনেক সুন্দর দেশ আর রাজ্য;
পশ্চিমের বহু দ্বীপের চারপাশে ঘুরেছি
যেগুলো কবিরা অ্যাপোলোর প্রতি আনুগত্যে ধরে রাখে।
প্রায়ই শুনেছিলাম এক বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের কথা
যা গভীর-ললাট হোমার শাসন করতেন নিজের রাজ্য হিসেবে;
তবু তার নির্মল প্রশান্ত বাতাসে কখনো শ্বাস নিইনি
যতক্ষণ না শুনলাম চ্যাপম্যানকে উচ্চকণ্ঠে, সাহসে বলতে:
তখন মনে হলো আমি যেন আকাশের কোনো পর্যবেক্ষক
যার দৃষ্টিসীমায় ভেসে এল এক নতুন গ্রহ;
কিংবা দৃঢ় কর্তেসের মতো, যখন ঈগলের চোখে
তিনি চেয়ে রইলেন প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে—আর তাঁর সব সঙ্গী
একে অপরের দিকে তাকাল এক বন্য বিস্ময়ে—
নিঃশব্দে, দারিয়েনের এক শৃঙ্গে দাঁড়িয়ে।

04To Autumn1820

English

Season of mists and mellow fruitfulness,
Close bosom-friend of the maturing sun;
Conspiring with him how to load and bless
With fruit the vines that round the thatch-eves run;
To bend with apples the moss’d cottage-trees,
And fill all fruit with ripeness to the core;
To swell the gourd, and plump the hazel shells
With a sweet kernel; to set budding more,
And still more, later flowers for the bees,
Until they think warm days will never cease,
For summer has o’er-brimm’d their clammy cells.

Who hath not seen thee oft amid thy store?
Sometimes whoever seeks abroad may find
Thee sitting careless on a granary floor,
Thy hair soft-lifted by the winnowing wind;
Or on a half-reap’d furrow sound asleep,
Drows’d with the fume of poppies, while thy hook
Spares the next swath and all its twined flowers:
And sometimes like a gleaner thou dost keep
Steady thy laden head across a brook;
Or by a cyder-press, with patient look,
Thou watchest the last oozings hours by hours.

Where are the songs of spring? Ay, Where are they?
Think not of them, thou hast thy music too,—
While barred clouds bloom the soft-dying day,
And touch the stubble-plains with rosy hue;
Then in a wailful choir the small gnats mourn
Among the river sallows, borne aloft
Or sinking as the light wind lives or dies;
And full-grown lambs loud bleat from hilly bourn;
Hedge-crickets sing; and now with treble soft
The red-breast whistles from a garden-croft;
And gathering swallows twitter in the skies.

বাংলা অনুবাদ

কুয়াশা আর কোমল ফলভারের ঋতু,
পরিণত সূর্যের অন্তরঙ্গ বন্ধু;
তার সঙ্গে মিলে ভাবছ কীভাবে ভরিয়ে দেবে, আশীর্বাদ করবে
খড়ের চালের কিনারা ঘিরে থাকা লতাগুলোকে ফলে;
শ্যাওলা-ঢাকা কুটিরের গাছগুলো আপেলের ভারে নুইয়ে দেবে,
প্রতিটি ফল ভেতর পর্যন্ত পাকিয়ে ভরে দেবে;
লাউ ফুলিয়ে দেবে, হেজেলের খোসা পুষ্ট করবে
মিষ্টি শাঁসে; আরও কুঁড়ি ফোটাবে,
আরও, আরও দেরিতে ফোটা ফুল মৌমাছির জন্য,
যতক্ষণ না তারা ভাবে উষ্ণ দিন কখনো ফুরাবে না,
কারণ গ্রীষ্ম তাদের আঠালো মৌচাক উপচে ভরে দিয়েছে।

কে না তোমাকে প্রায়ই দেখেছে তোমার ভাণ্ডারের মাঝে?
কখনো কখনো যে বাইরে খোঁজে, সে দেখতে পায়
তুমি নিশ্চিন্তে বসে আছ গোলাঘরের মেঝেতে,
শস্য-ঝাড়া হাওয়ায় তোমার চুল আলতো উড়ছে;
কিংবা আধা-কাটা ক্ষেতের আলে গভীর ঘুমে,
পপি ফুলের গন্ধে তন্দ্রাচ্ছন্ন, আর তোমার কাস্তে
রেহাই দিয়েছে পরের সারি আর তাতে জড়ানো ফুলগুলোকে:
আর কখনো শস্য-কুড়ানির মতো তুমি
বোঝাই মাথা স্থির রেখে পার হও ছোট নদী;
কিংবা আপেলের রস-পেষাই যন্ত্রের পাশে, ধৈর্যভরা চোখে
ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেখো শেষ ফোঁটাগুলো চুঁইয়ে পড়া।

কোথায় বসন্তের গান? হ্যাঁ, কোথায় তারা?
তাদের কথা ভেবো না, তোমারও আছে নিজের সংগীত,—
যখন ডোরাকাটা মেঘ ফুটিয়ে তোলে কোমল মরে-আসা দিন,
আর ফসল-কাটা মাঠ ছুঁয়ে দেয় গোলাপি আভায়;
তখন বিলাপী সুরে ছোট মশারা কাঁদে
নদীতীরের উইলো গাছের মাঝে, কখনো উপরে উঠে
কখনো নেমে, যেমন হালকা হাওয়া বাঁচে বা মরে;
আর বড় হয়ে ওঠা ভেড়ার ছানারা পাহাড়ি সীমানা থেকে জোরে ডাকে;
ঝোপের ঝিঁঝিঁ গায়; আর এখন মিহি সুরে
বাগানের কোণ থেকে শিস দেয় রবিন পাখি;
আর জড়ো হওয়া সোয়ালোরা আকাশে কিচিরমিচির করে।

05On the Grasshopper and Cricket1817

English

The poetry of earth is never dead:
When all the birds are faint with the hot sun,
And hide in cooling trees, a voice will run
From hedge to hedge about the new-mown mead;
That is the Grasshopper’s—he takes the lead
In summer luxury,—he has never done
With his delights; for when tired out with fun
He rests at ease beneath some pleasant weed.
The poetry of earth is ceasing never:
On a lone winter evening, when the frost
Has wrought a silence, from the stove there shrills
The Cricket’s song, in warmth increasing ever,
And seems to one in drowsiness half lost,
The Grasshopper’s among some grassy hills.

বাংলা অনুবাদ

পৃথিবীর কবিতা কখনো মরে না:
যখন সব পাখি তপ্ত সূর্যে ক্লান্ত হয়ে
শীতল গাছে লুকোয়, তখন একটি কণ্ঠ ছুটে যায়
সদ্য-কাটা ঘাসের মাঠে এক ঝোপ থেকে আরেক ঝোপে;
সে ফড়িঙের কণ্ঠ—সে-ই নেতৃত্ব দেয়
গ্রীষ্মের বিলাসে,—তার আনন্দের কখনো শেষ হয় না;
কারণ খেলায় ক্লান্ত হলে
সে আরামে বিশ্রাম নেয় কোনো মনোরম ঘাসের নিচে।
পৃথিবীর কবিতা কখনো থামে না:
কোনো নিঃসঙ্গ শীতসন্ধ্যায়, যখন তুষার
গড়ে তোলে নিস্তব্ধতা, চুলার পাশ থেকে তীক্ষ্ণ সুরে ভেসে আসে
ঝিঁঝিঁপোকার গান, উষ্ণতায় ক্রমে আরও জোরালো,
আর আধো-তন্দ্রায় হারিয়ে থাকা কারও কাছে মনে হয়
যেন কোনো ঘাসভরা পাহাড়ে গাইছে সেই ফড়িং।

04

Percy Bysshe Shelley

1792–1822 · England

01Ozymandias1818

English

I met a traveller from an antique land,
Who said—“Two vast and trunkless legs of stone
Stand in the desert. . . . Near them, on the sand,
Half sunk a shattered visage lies, whose frown,
And wrinkled lip, and sneer of cold command,
Tell that its sculptor well those passions read
Which yet survive, stamped on these lifeless things,
The hand that mocked them, and the heart that fed;
And on the pedestal, these words appear:
My name is Ozymandias, King of Kings;
Look on my Works, ye Mighty, and despair!
Nothing beside remains. Round the decay
Of that colossal Wreck, boundless and bare
The lone and level sands stretch far away.”

বাংলা অনুবাদ

এক প্রাচীন দেশ থেকে আসা এক পথিকের সঙ্গে দেখা হলো,
সে বলল—“পাথরের দুটি বিশাল, দেহহীন পা
দাঁড়িয়ে আছে মরুভূমিতে… তাদের কাছে, বালিতে,
আধা-ডোবা পড়ে আছে এক ভাঙা মুখ, যার ভ্রূকুটি,
কোঁচকানো ঠোঁট, আর শীতল আদেশের তাচ্ছিল্য
বলে দেয়, তার ভাস্কর সেই আবেগগুলো ভালোই পড়েছিল
যা আজও বেঁচে আছে এই প্রাণহীন পাথরে খোদাই হয়ে,
যে হাত তাদের ব্যঙ্গ করেছিল, আর যে হৃদয় তাদের পুষেছিল, তাদের ছাড়িয়েও;
আর বেদির ওপর লেখা আছে এই কথাগুলো:
আমার নাম ওজিমানডিয়াস, রাজাধিরাজ;
হে পরাক্রমশালীরা, আমার কীর্তি দেখো, আর হতাশ হও!
আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। সেই বিশাল ধ্বংসাবশেষের
চারপাশে, সীমাহীন আর শূন্য,
নিঃসঙ্গ সমতল বালু বহুদূর বিস্তৃত।”

02Music, When Soft Voices Die1824

English

Music, when soft voices die,
Vibrates in the memory—
Odours, when sweet violets sicken,
Live within the sense they quicken.

Rose leaves, when the rose is dead,
Are heaped for the belovèd’s bed;
And so thy thoughts, when thou art gone,
Love itself shall slumber on.

বাংলা অনুবাদ

সংগীত, যখন কোমল কণ্ঠ থেমে যায়,
স্মৃতিতে কম্পিত হতে থাকে—
সুবাস, যখন মিষ্টি ভায়োলেট ঝরে যায়,
বেঁচে থাকে সেই অনুভূতিতে, যাকে সে জাগিয়েছিল।

গোলাপের পাপড়ি, যখন গোলাপ মরে যায়,
স্তূপ করা হয় প্রিয়জনের শয্যায়;
তেমনি তোমার ভাবনাগুলো, যখন তুমি চলে যাবে,
তাদের ওপর ভালোবাসা নিজেই ঘুমিয়ে থাকবে।

03Love’s Philosophy1819

English

The fountains mingle with the river
And the rivers with the ocean,
The winds of heaven mix for ever
With a sweet emotion;
Nothing in the world is single;
All things by a law divine
In one spirit meet and mingle.
Why not I with thine?—

See the mountains kiss high heaven
And the waves clasp one another;
No sister-flower would be forgiven
If it disdained its brother;
And the sunlight clasps the earth
And the moonbeams kiss the sea:
What is all this sweet work worth
If thou kiss not me?

বাংলা অনুবাদ

ঝরনা মেশে নদীর সাথে
আর নদীরা মেশে সমুদ্রে,
আকাশের বাতাস চিরকাল মিশে থাকে
এক মধুর আবেগে;
পৃথিবীতে কিছুই একা নয়;
সব কিছুই এক ঐশ্বরিক নিয়মে
এক আত্মায় মিলিত হয়, মিশে যায়।
তবে আমি কেন তোমার সাথে নয়?—

দেখো, পাহাড় চুম্বন করে উঁচু আকাশকে
আর ঢেউরা জড়িয়ে ধরে একে অপরকে;
কোনো বোন-ফুল ক্ষমা পেত না
যদি সে তার ভাইকে অবজ্ঞা করত;
আর সূর্যালোক জড়িয়ে ধরে পৃথিবীকে
আর চাঁদের আলো চুম্বন করে সমুদ্রকে:
এই সব মধুর কাজের কী মূল্য
যদি তুমি আমায় চুম্বন না করো?

04To — (One word is too often profaned)1824

English

One word is too often profaned
For me to profane it,
One feeling too falsely disdained
For thee to disdain it;
One hope is too like despair
For prudence to smother,
And pity from thee more dear
Than that from another.

I can give not what men call love,
But wilt thou accept not
The worship the heart lifts above
And the Heavens reject not,—
The desire of the moth for the star,
Of the night for the morrow,
The devotion to something afar
From the sphere of our sorrow?

বাংলা অনুবাদ

একটি শব্দ বড় বেশি অপবিত্র হয়েছে
আমার পক্ষে তাকে আর অপবিত্র করা চলে না,
একটি অনুভূতি বড় বেশি মিথ্যে অবজ্ঞা পেয়েছে
তোমার পক্ষে তাকে আর অবজ্ঞা করা চলে না;
একটি আশা হতাশার এত কাছাকাছি
যে বিবেচনা তাকে চেপে রাখতে পারে না,
আর তোমার করুণা আমার কাছে বেশি প্রিয়
অন্য কারও করুণার চেয়ে।

মানুষ যাকে ভালোবাসা বলে, তা আমি দিতে পারি না,
কিন্তু তুমি কি গ্রহণ করবে না
সেই পূজা, যা হৃদয় ঊর্ধ্বে তুলে ধরে
আর স্বর্গও যাকে প্রত্যাখ্যান করে না,—
তারার প্রতি পতঙ্গের আকাঙ্ক্ষা,
আগামী দিনের প্রতি রাতের আকুলতা,
আমাদের দুঃখের জগৎ থেকে বহু দূরের
কোনো কিছুর প্রতি এক নিবেদন?

05Mutability (The flower that smiles to-day)1824

English

The flower that smiles to-day
To-morrow dies;
All that we wish to stay
Tempts and then flies.
What is this world’s delight?
Lightning that mocks the night,
Brief even as bright.

Virtue, how frail it is!
Friendship how rare!
Love, how it sells poor bliss
For proud despair!
But we, though soon they fall,
Survive their joy, and all
Which ours we call.

Whilst skies are blue and bright,
Whilst flowers are gay,
Whilst eyes that change ere night
Make glad the day;
Whilst yet the calm hours creep,
Dream thou—and from thy sleep
Then wake to weep.

বাংলা অনুবাদ

যে ফুল আজ হাসে
কাল সে মরে যায়;
যা কিছু আমরা ধরে রাখতে চাই
প্রলুব্ধ করে, তারপর উড়ে যায়।
এ পৃথিবীর আনন্দ কী?
রাতকে ব্যঙ্গ করা বিদ্যুতের ঝলক,
যতটা উজ্জ্বল, ততটাই ক্ষণিক।

সদ্গুণ, কত ভঙ্গুর!
বন্ধুত্ব, কত দুর্লভ!
ভালোবাসা, কীভাবে সে বিক্রি করে সামান্য সুখ
অহংকারী হতাশার বিনিময়ে!
কিন্তু আমরা, যদিও তারা শিগগিরই ঝরে যায়,
বেঁচে থাকি তাদের আনন্দের পরেও, আর সব কিছুর পরেও
যাকে আমরা নিজের বলি।

যতক্ষণ আকাশ নীল আর উজ্জ্বল,
যতক্ষণ ফুলেরা প্রফুল্ল,
যতক্ষণ রাত নামার আগেই বদলে যাওয়া চোখ
দিনকে আনন্দময় করে;
যতক্ষণ শান্ত প্রহরগুলো ধীরে বয়ে চলে,
স্বপ্ন দেখো—আর তারপর ঘুম থেকে
জেগে উঠে কাঁদো।

05

Walt Whitman

1819–1892 · United States

01O Captain! My Captain!1865

English

O Captain! my Captain! our fearful trip is done,
The ship has weather’d every rack, the prize we sought is won,
The port is near, the bells I hear, the people all exulting,
While follow eyes the steady keel, the vessel grim and daring;
But O heart! heart! heart!
O the bleeding drops of red,
Where on the deck my Captain lies,
Fallen cold and dead.

O Captain! my Captain! rise up and hear the bells;
Rise up—for you the flag is flung—for you the bugle trills,
For you bouquets and ribbon’d wreaths—for you the shores a-crowding,
For you they call, the swaying mass, their eager faces turning;
Here Captain! dear father!
This arm beneath your head!
It is some dream that on the deck,
You’ve fallen cold and dead.

My Captain does not answer, his lips are pale and still,
My father does not feel my arm, he has no pulse nor will,
The ship is anchor’d safe and sound, its voyage closed and done,
From fearful trip the victor ship comes in with object won;
Exult O shores, and ring O bells!
But I with mournful tread,
Walk the deck my Captain lies,
Fallen cold and dead.

বাংলা অনুবাদ

হে ক্যাপ্টেন! আমার ক্যাপ্টেন! আমাদের ভয়ংকর যাত্রা শেষ হয়েছে,
জাহাজ পেরিয়ে এসেছে সব ঝড়, যে পুরস্কার চেয়েছিলাম তা জেতা হয়েছে,
বন্দর কাছে, ঘণ্টা শুনছি, সব মানুষ উল্লাসে মত্ত,
চোখগুলো অনুসরণ করছে অবিচল জাহাজের তলি, ভয়াল আর সাহসী তরীটিকে;
কিন্তু হায় হৃদয়! হৃদয়! হৃদয়!
হায়, লাল রক্তের ফোঁটা,
যেখানে ডেকের ওপর আমার ক্যাপ্টেন শুয়ে আছেন,
শীতল আর মৃত হয়ে পড়ে।

হে ক্যাপ্টেন! আমার ক্যাপ্টেন! উঠুন, শুনুন ঘণ্টাধ্বনি;
উঠুন—আপনার জন্যই পতাকা উড়ছে—আপনার জন্যই বিউগল বাজছে,
আপনার জন্য ফুলের তোড়া আর ফিতে-বাঁধা মালা—আপনার জন্যই তীরে ভিড়,
আপনাকেই ডাকছে দুলতে থাকা জনতা, তাদের ব্যাকুল মুখ ফেরানো;
এই যে ক্যাপ্টেন! প্রিয় পিতা!
এই আমার বাহু আপনার মাথার নিচে!
এ যেন কোনো স্বপ্ন যে ডেকের ওপর
আপনি শীতল আর মৃত হয়ে পড়ে আছেন।

আমার ক্যাপ্টেন উত্তর দেন না, তাঁর ঠোঁট ফ্যাকাশে আর স্থির,
আমার পিতা আমার বাহু অনুভব করেন না, তাঁর নাড়ি নেই, ইচ্ছাও নেই,
জাহাজ নিরাপদে নোঙর করেছে, তার যাত্রা শেষ, সমাপ্ত,
ভয়ংকর যাত্রা থেকে বিজয়ী জাহাজ ফিরেছে লক্ষ্য জয় করে;
উল্লাস করো হে তীর, বাজো হে ঘণ্টা!
কিন্তু আমি শোকার্ত পায়ে
হাঁটি সেই ডেকে, যেখানে আমার ক্যাপ্টেন শুয়ে আছেন,
শীতল আর মৃত হয়ে পড়ে।

02I Hear America Singing1860

English

I hear America singing, the varied carols I hear,
Those of mechanics, each one singing his as it should be blithe and strong,
The carpenter singing his as he measures his plank or beam,
The mason singing his as he makes ready for work, or leaves off work,
The boatman singing what belongs to him in his boat, the deckhand singing on the steamboat deck,
The shoemaker singing as he sits on his bench, the hatter singing as he stands,
The wood-cutter’s song, the ploughboy’s on his way in the morning, or at noon intermission or at sundown,
The delicious singing of the mother, or of the young wife at work, or of the girl sewing or washing,
Each singing what belongs to him or her and to none else,
The day what belongs to the day—at night the party of young fellows, robust, friendly,
Singing with open mouths their strong melodious songs.

বাংলা অনুবাদ

আমি শুনি আমেরিকা গাইছে, শুনি নানা রকম গান,
কারিগরদের গান, প্রত্যেকে গাইছে নিজের গান, যেমন হওয়া উচিত—প্রফুল্ল আর বলিষ্ঠ,
ছুতোর গাইছে তার গান, যখন সে তক্তা বা কড়িকাঠ মাপে,
রাজমিস্ত্রি গাইছে তার গান, যখন সে কাজের জন্য তৈরি হয়, বা কাজ শেষ করে,
মাঝি গাইছে তার নৌকায় যা তার নিজের, মাল্লা গাইছে স্টিমারের ডেকে,
মুচি গাইছে তার বেঞ্চে বসে, টুপিওয়ালা গাইছে দাঁড়িয়ে,
কাঠুরের গান, চাষার ছেলের গান সকালে পথে যেতে, বা দুপুরের বিরতিতে, বা সূর্যাস্তে,
মায়ের মধুর গান, বা কাজে ব্যস্ত নববধূর, বা সেলাই কিংবা কাপড় কাচতে থাকা মেয়ের,
প্রত্যেকে গাইছে যা তার নিজের, আর কারও নয়,
দিন গাইছে যা দিনের—রাতে তরুণদের দল, বলিষ্ঠ, বন্ধুসুলভ,
খোলা গলায় গাইছে তাদের জোরালো, সুরেলা গান।

03A Noiseless Patient Spider1868

English

A noiseless patient spider,
I mark’d where on a little promontory it stood isolated,
Mark’d how to explore the vacant vast surrounding,
It launch’d forth filament, filament, filament, out of itself,
Ever unreeling them, ever tirelessly speeding them.

And you O my soul where you stand,
Surrounded, detached, in measureless oceans of space,
Ceaselessly musing, venturing, throwing, seeking the spheres to connect them,
Till the bridge you will need be form’d, till the ductile anchor hold,
Till the gossamer thread you fling catch somewhere, O my soul.

বাংলা অনুবাদ

এক নিঃশব্দ, ধৈর্যশীল মাকড়সা,
আমি লক্ষ করলাম, এক ছোট্ট অন্তরীপে সে একা দাঁড়িয়ে,
লক্ষ করলাম, চারপাশের শূন্য বিশালতা খুঁজে দেখতে
সে নিজের ভেতর থেকে ছুড়ে দিল সুতো, সুতো, সুতো,
অবিরাম খুলে চলেছে, অক্লান্তভাবে ছুড়ে চলেছে।

আর তুমি, হে আমার আত্মা, যেখানে তুমি দাঁড়িয়ে,
ঘেরা, বিচ্ছিন্ন, মহাশূন্যের অপরিমেয় সমুদ্রে,
অবিরাম ভাবছ, ঝুঁকি নিচ্ছ, ছুড়ে দিচ্ছ, খুঁজছ গোলকগুলোকে জুড়ে দিতে,
যতক্ষণ না তোমার প্রয়োজনীয় সেতু গড়ে ওঠে, যতক্ষণ না নমনীয় নোঙর আঁকড়ে ধরে,
যতক্ষণ না তোমার ছুড়ে দেওয়া সূক্ষ্ম সুতো কোথাও আটকে যায়, হে আমার আত্মা।

04When I Heard the Learn’d Astronomer1865

English

When I heard the learn’d astronomer,
When the proofs, the figures, were ranged in columns before me,
When I was shown the charts and diagrams, to add, divide, and measure them,
When I sitting heard the astronomer where he lectured with much applause in the lecture-room,
How soon unaccountable I became tired and sick,
Till rising and gliding out I wander’d off by myself,
In the mystical moist night-air, and from time to time,
Look’d up in perfect silence at the stars.

বাংলা অনুবাদ

যখন আমি শুনলাম সেই বিদ্বান জ্যোতির্বিদকে,
যখন প্রমাণ আর সংখ্যাগুলো সারি সারি সাজানো হলো আমার সামনে,
যখন আমাকে দেখানো হলো চার্ট আর নকশা, সেগুলো যোগ করতে, ভাগ করতে, মাপতে,
যখন আমি বসে শুনলাম জ্যোতির্বিদ বক্তৃতাকক্ষে প্রচুর করতালির মধ্যে বক্তৃতা দিচ্ছেন,
কত তাড়াতাড়ি, অকারণেই, আমি ক্লান্ত আর অসুস্থ হয়ে পড়লাম,
যতক্ষণ না উঠে, নিঃশব্দে বেরিয়ে একা একা হেঁটে চললাম,
রহস্যময়, আর্দ্র রাতের বাতাসে, আর মাঝে মাঝে
পরিপূর্ণ নীরবতায় তাকালাম তারাদের দিকে।

05O Me! O Life!1867

English

O me! O life! of the questions of these recurring,
Of the endless trains of the faithless, of cities fill’d with the foolish,
Of myself forever reproaching myself, (for who more foolish than I, and who more faithless?)
Of eyes that vainly crave the light, of the objects mean, of the struggle ever renew’d,
Of the poor results of all, of the plodding and sordid crowds I see around me,
Of the empty and useless years of the rest, with the rest me intertwined,
The question, O me! so sad, recurring—What good amid these, O me, O life?

Answer.
That you are here—that life exists and identity,
That the powerful play goes on, and you may contribute a verse.

বাংলা অনুবাদ

হায় আমি! হায় জীবন! এই প্রশ্নগুলো, যা বারবার ফিরে আসে,
অবিশ্বাসীদের অন্তহীন মিছিল, বোকায় ভরা শহরগুলো,
নিজেকে চিরকাল নিজেই ভর্ৎসনা করা, (কারণ আমার চেয়ে বোকা কে, আর কে বেশি অবিশ্বাসী?)
যে চোখ বৃথাই আলো চায়, তুচ্ছ লক্ষ্যগুলো, চিরকাল নতুন করে শুরু হওয়া সংগ্রাম,
সব কিছুর দীন ফলাফল, চারপাশে দেখা ক্লান্ত আর হীন ভিড়,
বাকিদের শূন্য আর অর্থহীন বছর, যাদের সঙ্গে আমিও জড়িয়ে,
প্রশ্নটা, হায়! এত বিষণ্ণ, বারবার ফিরে আসে—এসবের মাঝে কী ভালো আছে, হায় আমি, হায় জীবন?

উত্তর।
এই যে তুমি এখানে আছ—জীবন আছে, আর আছে পরিচয়,
এই যে মহা নাটক চলছে, আর তুমি তাতে একটি পঙ্ক্তি যোগ করতে পারো।

06

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর · Rabindranath Tagore

1861–1941 · Bengal · Nobel Prize in Literature, 1913

01সোনার তরীকাব্যগ্রন্থ: সোনার তরী

মূল বাংলা

গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা।
কূলে একা বসে’ আছি, নাহি ভরসা।
রাশি রাশি ভারা ভারা
ধান কাটা হ’ল সারা,
ভরা নদী ক্ষুরধারা
খর-পরশা।
কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা।

একখানি ছোট ক্ষেত আমি একেলা,
চারিদিকে বাঁকা জল করিছে খেলা।
পরপারে দেখি আঁকা
তরুছায়ামসীমাখা
গ্রামখানি মেঘে ঢাকা
প্রভাত বেলা।
এ পারেতে ছোট ক্ষেত আমি একেলা।

গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে!
দেখে’ যেন মনে হয় চিনি উহারে।
ভরা-পালে চলে যায়,
কোন দিকে নাহি চায়,
ঢেউগুলি নিরুপায়
ভাঙ্গে দু’ধারে,
দেখে’ যেন মনে হয় চিনি উহারে!

ওগো তুমি কোথা যাও কোন্ বিদেশে!
বারেক ভিড়াও তরী কূলেতে এসে!
যেয়ো যেথা যেতে চাও,
যারে খুসি তারে দাও
শুধু তুমি নিয়ে যাও
ক্ষণিক হেসে
আমার সোনার ধান কূলেতে এসে!

যত চাও তত লও তরণী পরে।
আর আছে?—আর নাই, দিয়েছি ভরে’।
এতকাল নদীকূলে
যাহা লয়ে ছিনু ভুলে’
সকলি দিলাম তুলে
থরে বিথরে
এখন আমারে লহ করুণা করে’!

ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই! ছোট সে তরী
আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি’।
শ্রাবণ গগন ঘিরে
ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,
শূন্য নদীর তীরে
রহিনু পড়ি’,
যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।

02দুই বিঘা জমিকাব্যগ্রন্থ: চিত্রা

মূল বাংলা

শুধু বিঘে দুই ছিল মোর ভুঁই, আর সবি গেছে ঋণে।
বাবু বলিলেন “বুঝেছ উপেন, এ জমি লইব কিনে।”
কহিলাম আমি “তুমি ভূস্বামী, ভূমির অন্ত নাই।
চেয়ে দেখ মোর আছে বড়জোর মরিবার মত ঠাঁই।”
শুনি রাজা কহে “বাপু, জানত হে, করেছি বাগানখানা,
পেলে দুই বিঘে প্রস্থে ও দীঘে সমান হইবে টানা,—
ওটা দিতে হবে।”-কহিলাম তবে বক্ষে জুড়িয়া পাণি
সজল চক্ষে, “করুন্ রক্ষে গরীবের ভিটেখানি!

সপ্তপুরুষ যেথায় মানুষ সে মাটি সোণার বাড়া,
দৈন্যের দায়ে বেচিব সে মায়ে এমনি লক্ষ্মীছাড়া”!
আঁখি করি লাল রাজা ক্ষণকাল রহিল মৌনভাবে,
কহিলেন শেষে ক্রুর হাসি হেসে, “আচ্ছা সে দেখা যাবে”!

পরে মাস দেড়ে ভিটেমাটি ছেড়ে বাহির হইনু পথে-
করিল ডিক্রি, সকলি বিক্রি মিথ্যা দেনার খতে।
এ জগতে, হায়, সেই বেশি চায় আছে যার ভুরি ভুরি!
রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি!
মনে ভাবিলাম মোরে ভগবান রাখিবে না মোহগর্ত্তে,
তাই লিখি দিল বিশ্ব-নিখিল দু বিঘার পরিবর্ত্তে!
সন্ন্যাসীবেশে ফিরি দেশে দেশে হইয়া সাধুর শিষ্য,
কত হেরিলাম মনোহর ধাম, কত মনোরম দৃশ্য।
ভূধরে সাগরে বিজনে নগরে যখন যেখানে ভ্রমি,
তবু নিশিদিনে ভূলিতে পারিনে সেই বিঘা দুই জমি!
হাটে মাঠে বাটে এই মত কাটে বছর পনেরো ষোলো,
একদিন শেষে ফিরিবারে দেশে বড়ই বাসনা হোলো।

নমোনমো নমঃ, সুন্দরী মম জননী বঙ্গভূমি!
গঙ্গার তীর স্নিগ্ধ সমীর জীবন জুড়ালে তুমি!

অবারিত মাঠ, গগন-ললাট চুমে তব পদ-ধূলি,
ছায়া-সুনিবিড় শান্তির নীড় ছোট ছোট গ্রামগুলি।
পল্লবঘন আম্রকানন, রাখালের খেলাগেহ।
স্তব্ধ অতল দীঘি-কালোজল, নিশীথশীতল স্নেহ।
বুকভরা মধু বঙ্গের বধূ জল লয়ে যায় ঘরে,
মা বলিতে প্রাণ করে অনচান, চখে আসে জল ভরে’।
দুই দিন পরে দ্বিতীয় প্রহরে প্রবেশিনু নিজগ্রামে।
কুমোরের বাড়ি দক্ষিণে ছাড়ি, রথ-তলা করি বামে
রাখি হাটখোলা নন্দীর গোলা, মন্দির করি পাছে
তৃষাতুর শেষে পঁহুছিনু এসে আমার বাড়ির কাছে।

ধিক্ ধিক ওরে, শতধিক্ তোর, নিলাজ কুলটা ভূমি!
যখনি যাহার তখনি তাহার, এই কি জননী তুমি!
সে কি মনে হবে একদিন যবে ছিলে দরিদ্র-মাতা,
আঁচল ভরিয়া রাখিতে ধরিয়া ফলফুল শাকপাতা!
আজ কোন্ রীতে কারে ভুলাইতে ধরেছ বিলাস-বেশ,
পাঁচরঙা পাতা অঞ্চলে গাঁথা, পুষ্পে খচিত কেশ!
আমি তোর লাগি ফিরেছি বিবাগী গৃহহারা সুখহীন,
তুই হেথা বসি ওরে রাক্ষসী হাসিয়া কাটাস্ দিন!

ধনীর আদরে গরব না ধরে!-এতই হয়েছ ভিন্ন
কোন খানে লেশ নাহি অবশেষ সে দিনের কোন চিহ্ন!
কল্যাণময়ী ছিলে তুমি অয়ি, ক্ষুধাহরা সুধারাশি;
যত হাস আজ, যত কর সাজ, ছিলে দেবী, হলে দাসী।

বিদীর্ণহিয়া ফিয়িয়া ফিরিয়া চারিদিকে চেয়ে দেখি;
প্রাচীরের কাছে এখনো যে আছে, সেই আম গাছ এ কি!
বসি তার তলে নয়নের জলে শান্ত হইল ব্যথা,
একে একে মনে উদিল স্মরণে বালক কালের কথা।
সেই মনে পড়ে জ্যৈষ্ঠের ঝড়ে রাত্রে নাহিক ঘুম,
অতি ভোরে উঠি তাড়াতাড়ি ছুটি আম কুড়াবার ধুম।
সেই সুমধুর স্তব্ধ দুপুর, পাঠশালা-পলায়ন,—
ভাবিলাম হায় আর কি কোথায় ফিরে পাব সে জীবন!
সহসা বাতাস ফেলি গেল শ্বাস শাখা দুলাইয়া গাছে;
দুটি পাকা ফল লভিল ভূতল আমার কোলের কাছে।
ভাবিলাম মনে বুঝি এতখনে আমারে চিনিল মাতা!
স্নেহের সে দানে বহু সম্মানে বারেক ঠেকানু মাথা।

হেনকালে হায় যমদূত প্রায় কোথা হতে এল মালী!
ঝুটি-বাঁধা উড়ে সপ্তম সুয়ে পাড়িতে লাগিল গালী।

কহিলাম তবে, “আমিত নীরবে দিয়েছি আমার সব,
দুটি ফল তার করি অধিকার, এত তারি কলরব”!
চিনিল না মোরে নিয়ে গেল ধরে’ কাঁধে তুলি লাঠিগাছ,
বাবু ছিপ হাতে পারিষদ সাথে ধরিতেছিলেন মাছ।
শুনি বিবরণ ক্রোধে তিনি কন্ “মারিয়া করিব খুন"!
বাবু যত বলে, পারিষদদলে বলে তার শতগুণ!
আমি কহিলাম, “শুধু দুটি আম ভীখ্ মাগি মহাশয়”!
বাবু কহে হেসে “বেটা সাধুবেশে পাকা চোর অতিশয়”!
আমি শুনে হাসি, আঁখিজলে ভাসি, এই ছিল মোর ঘটে!
তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে!

03নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গকাব্যগ্রন্থ: প্রভাত-সঙ্গীত

মূল বাংলা

আজি এ প্রভাতে প্রভাত-বিহগ
কি গান গাইল রে!
অতিদূর-দূর আকাশ হইতে
ভাসিয়া আইল রে।
না জানি কেমনে পশিল হেথায়
পথহারা তার একটি তান,
আঁধার গুহায় ভ্রমিয়া ভ্রমিয়া,
গভীর গুহায় নামিয়া নামিয়া,
আকুল হইয়া কাঁদিয়া কাঁদিয়া
ছুঁয়েছে আমার প্রাণ।

আজি এ প্রভাতে সহসা কেনরে
পথহারা রবি-কর
আলয় না পেয়ে পড়েছে আসিয়ে
আমার প্রাণের ’পর।
বহুদিন পরে একটি কিরণ
গুহায় দিয়েছে দেখা,
পড়েছে আমার আঁধার সলিলে
একটি কনক-রেখা।

প্রাণের আবেগ রাখিতে নারি,
থরথর করি কাঁপিছে বারি,
টলমল জল করে থলথল,
কলকল করি ধরেছে তান।
আজি এ প্রভাতে কি জানি কেনরে
জাগিয়া উঠেছে প্রাণ।
জাগিয়া দেখিনু চারিদিকে মোর
পাষাণে রচিত কারাগার ঘোর,
বুকের উপরে আঁধার বসিয়া
করিছে নিজের ধ্যান।
না জানি কেনরে এত দিন পরে
জাগিয়া উঠেছে প্রাণ।

জাগিয়া দেখিনু আমি আঁধারে রয়েছি আঁধা,
আপনারি মাঝে আমি আপনি রয়েছি বাঁধা।
রয়েছি মগন হয়ে আপনারি কলস্বরে,
ফিরে আসে প্রতিধ্বনি নিজেরি শ্রবণপরে।
গভীর—গভীর গুহা, গভীর আঁধার ঘোর,
গভীর ঘুমন্ত প্রাণ একেলা গাহিছে গান,
মিশিছে স্বপন-গীতি বিজন হৃদয়ে মোর।
দূর-দূর-দূর হতে ভেদিয়া আঁধার-কারা
মাঝে মাঝে দেখা দেয় একটি সন্ধ্যার তারা।

ঘুমায়ে দেখিরে যেন স্বপনের মোহ-মায়া,
পড়েছে প্রাণের মাঝে একটি হাসির ছায়া।
তারি মুখ দেখে দেখে— আঁধার হাসিতে শেখে;
তারি মুখ চেয়ে চেয়ে করে নিশি অবসান;
শিহরি উঠেরে বারি, দোলেরে—দোলেরে প্রাণ,
প্রাণের মাঝারে ভাসি দোলেরে—দোলেরে হাসি,
দোলেরে প্রাণের ’পরে আশার স্বপন মম,
দোলেরে তারার ছায়া সুখের আভাস সম।
প্রণয়-প্রতিমা যবে স্বপনে দেখেরে কবি,
অধীর সুখের ভরে কঁপে বুক থরথরে,
কম্পমান বক্ষ পরে দোলে সে মোহিনী ছবি;
দুখীর আঁধার প্রাণে সুখের সংশয় যথা,
দুলিয়া দুলিয়া সদা মৃদু মৃদু কহে কথা;
মৃদু ভয়, কভু মৃদু আশ,
মৃদু হাসি, কভু মৃদু শ্বাস।
বহুদিন পরে শোনা বিস্মৃত গানের তান,
দোলেরে প্রাণের মাঝে, দোলেরে আকুল প্রাণ;
আধ’ আধ’ জাগিছে স্মরণে,
পড়ে পড়ে, নাহি পড়ে মনে।
তেমনি তেমনি দোলে তারাটি আমার কোলে,
করতালি দিয়ে বারি কলকল গান গায়,
দোলায়ে দোলায়ে যেন ঘুম পাড়াইতে চায়!

মাঝে মাঝে একদিন আকাশেতে নাই আলো,
পড়িয়া মেঘের ছায়া কালো জল হয় কালো।
আঁধার সলিল পরে ঝরঝর বারি ঝরে
ঝরঝর ঝরঝর, দিবানিশি অবিরল,
বরষার দুখ-কথা, বরষার আঁখি-জল।
শুয়ে শুয়ে আনমনে দিবানিশি তাই শুনি,
একটি একটি করে দিবানিশি তাই গুণি,
তারি সাথে মিলাইয়া কলকল গান গাই,
ঝরঝর কলকল দিন নাই, রাত নাই।
এমনি নিজেরে লয়ে রয়েছি নিজের কাছে,
আঁধার সলিল পরে আঁধার জাগিয়া আছে।
এমনি নিজের কাছে খুলেছি নিজের প্রাণ,
এমনি পরের কাছে শুনেছি নিজের গান।

আজি এ প্রভাতে রবির কর
কেমনে পশিল প্রাণের ’পর,
কেমনে পশিল গুহার আঁধারে
প্রভাত-পাখীর গান!
না জানি কেনরে এত দিন পরে
জাগিয়া উঠিল প্রাণ!
জাগিয়া উঠেছে প্রাণ,
ওরে উথলি উঠেছে বারি,

ওরে প্রাণের বাসনা প্রাণের আবেগ
রুধিয়া রাখিতে নারি।
থরথর করি কাঁপিছে ভূধর,
শিলা রাশি রাশি পড়িছে খসে,
ফুলিয়া ফুলিয়া ফেনিল সলিল
গরজি উঠিছে দারুণ রোষে।
হেথায় হোথায় পাগলের প্রায়
ঘুরিয়া ঘুরিয়া মাতিয়া বেড়ায়,
বাহিরিতে চায়, দেখিতে না পায়
কোথায় কারার দ্বার।
প্রভাতেরে যেন লইতে কাড়িয়া,
আকাশেরে যেন ফেলিতে ছিঁড়িয়া
উঠে শূন্য পানে পড়ে আছাড়িয়া
করে শেষে হাহাকার।
প্রাণের উল্লাসে ছুটিতে চায়,
ভূধরের হিয়া টুটিতে চায়,
আলিঙ্গনতরে উর্দ্ধে বাহু তুলি
আকাশের পানে উঠিতে চায়।
প্রভাত-কিরণে পাগল হইয়া
জগৎ-মাঝারে লুটিতে চায়।
কেনরে বিধাতা পাষাণ হেন,
চারিদিকে তার বাঁধন কেন?

ভাঙ্রে হৃদয় ভাঙ্রে বাঁধন,
সাধ্রে আজিকে প্রাণের সাধন,
লহরীর পরে লহরী তুলিয়া
আঘাতের পর আঘাত কর্;
মাতিয়া যখন উঠেছে পরাণ
কিসের আঁধার কিসের পাষাণ,
উথলি যখন উঠেছে বাসনা
জগতে তখন কিসের ডর।

সহসা আজি এ জগতের মুখ
নূতন করিয়া দেখিনু কেন?
একটি পাখীর আধখানি তান
জগতের গান গাহিল যেন।
জগত দেখিতে হইব বাহির
আজিকে করেছি মনে,
দেখিব না আর নিজেরি স্বপন
বসিয়া গুহার কোণে।

আমি ঢালিব করুণা-ধারা,
আমি ভাঙিব পাষাণ-কারা,
আমি জগৎ প্লাবিয়া বেড়াব গাহিয়া
আকুল পাগলপারা।

কেশ এলাইয়া, ফুল কুড়াইয়া,
রামধনু-আঁকা পাখা উড়াইয়া,
রবির কিরণে হাসি ছড়াইয়া,
দিবরে পরাণ ঢালি।
শিখর হইতে শিখরে ছুটিব,
ভূধর হইতে ভূধরে লুটিব,
হেসে খলখল, গেয়ে কলকল
তালে তালে দিব তালি।

তটিনী হইয়া যাইব বহিয়া—
যাইব বহিয়া—যাইব বহিয়া—
হৃদয়ের কথা কহিয়া কহিয়া,
গাহিয়া গাহিয়া গান।
যত দেবো প্রাণ বহে যাবে প্রাণ,
ফুরাবে না আর প্রাণ।
এত কথা আছে, এত গান আছে,
এত প্রাণ আছে মোর,
এত সুখ আছে, এত সাধ আছে
প্রাণ হয়ে আছে ভোর

রবি শশী ভাঙি গাঁথিব হার,
আকাশ আঁকিয়া পরিব বাস।

সাঁঝের আকাশে করে গলাগলি
অলস কনক জলদরাশ,
অভিভূত হয়ে কনক-কিরণে
রাখিতে পারে না দেহের ভার।
যেনরে বিবশী হয়েছে গোধূলি,
পূরবে আঁধার বেণী পড়ে খুলি,
পশ্চিমেতে পড়ে খসিয়া খসিয়া
সোনার আঁচল তার।
মনে হবে যেন সোনা মেঘগুলি
খসিয়া পড়েছে আমারি জলে,
সুদূরে আমারি চরণতলে।
আকুলি বিকুলি শত বাহু তুলি
যতই তাহারে ধরিতে যাব
কিছুতেই তারে কাছে না পাব।
আকাশের তারা অবাক হবে,
সারাটি রজনী চাহিয়া রবে
জলের তারার পানে।
না পাবে ভাবিয়া এল কোথা হতে,
নিজের ছায়ারে যাবে চুমো খেতে
হেরিবে স্নেহের প্রাণে।
শ্যামল আমার দুইটি কুল,
মাঝে মাঝে তাহে ফুটিবে ফুল।

খেলাছলে কাছে আসিয়া লহরী
চকিতে চুমিয়া পলায়ে যাবে।
সরম-বিভলা কুসুম-রমণী
ফিরাবে আনন শিহরি অমনি,
আবেশেতে শেষে অবশ হইয়া
খসিয়া পড়িয়া যাবে।
ভেসে গিয়ে শেষে কাঁদিবে সে হায়
কিনারা কোথায় পাবে।
মেঘ-গরজনে বরষা আসিবে,
মদির-নয়নে বসন্ত হাসিবে,
বিশদ-বসনে শিশির-মালা
আসিবে সুধীরে শরৎ-বালা।
কূলে কূলে মোর উছলি জল
কুলুকুলু ধোবে চরণতল।
কূলে কূলে মোর ফুটিবে হাসি,
বিকশিত কাশ-কুসুম-রাশি।
বিমল গগনা বিভোর নগনা
পূরণিমা নিশি জোছনা-মগনা;
ঘুম-ঘোরে কভু গাহিবে কোকিল,
দূরে দূরে কভু বাজিবে বাঁশি।
দূর হতে আসে ফুলের বাস,
মূরছিয়া পড়ে মলয়-বায়;

দুরুদুরু মোর দুলিবে হিয়া
শিহরিয়া মোর উঠিবে কায়।
এত সুখ কোথা, এত রূপ কোথা,
এত খেলা কোথা আছে,
যৌবনের বেগে বহিয়া যাইব
কে জানে কাহার কাছে।
ওরে অগাধ বাসনা, অসীম আশা
জগৎ দেখিতে চাই।
জাগিয়াছে সাধ—চরাচরময়
প্লাবিয়া বহিয়া যাই।
যত প্রাণ আছে ঢালিতে পারি,
যত কাল আছে বহিতে পারি,
যত দেশ আছে ডুবাতে পারি,
তবে আর কিবা চাই,
পরাণের সাধ তাই।
কি জানি কি হল আজি, জাগিয়া উঠিল প্রাণ,
দূর হতে শুনি যেন মহাসাগরের গান।
সেই সাগরের পানে হৃদয় ছুটিতে চায়,
তারি পদপ্রান্তে গিয়ে জীবন টুটিতে চায়।
অহো কি মহান্ সুখ অনন্তে হইতে হারা,
মিশাতে অনন্ত প্রাণে অনন্ত প্রাণের ধারা!

ডাকে যেন—ডাকে যেন—সিন্ধু মোরে ডাকে যেন।
আজি চারিদিকে মোর কেন কারাগার হেন?
পৃথিবীরে বুকে লয়ে সমুদ্র একেলা বসি
অসীম প্রাণের কথা কহিতেছে দিবানিশি।
আপনি জানে না যেন,
আপনি বুঝে না যেন,
মহাসিন্ধু ধ্যানে বসি, আপনি উঠিছে বাণী;
কেহ শুনিবার নাই—নাই কোথা জনপ্রাণী।
কেবল আকাশ একা দাড়ায়ে রয়েছে তথা,
নীরব শিষ্যের মত শুনিছে মহান কথা।
কি কথারে—কি কথা সে—শুনিতে ব্যাকুল প্রাণ,
একেল কবির মত গাহিছে কিসের গান!
শীত নাই, গ্রীষ্ম নাই, দিন নাই, রাত্রি নাই,
সঙ্গী নাই, জনপ্রাণী নাই,
একাকী চরণপ্রান্তে বসিয়া শুনিব তাই।
আসিবে গভীর রাত্রি আঁধারে জগত ঢাকি
দিশাহারা অন্ধকারে মুদিয়া রহিব আঁখি।
স্তব্ধতার প্রাণ উঘাটিয়া
ভেদি সেই অন্ধকার ঘোর
কেবলি সে একতান
সমুদ্রের বেদগান
সারারাত্রি অবিশ্রাম পশিবে শ্রবণে মোর।

ওই যে হৃদয় মোর আহ্বান শুনিতে পায়,
“কে আসিবি, কে আসিবি, কে তোরা আসিবি আয়!
পাষাণ বাঁধন টুটি, ভিজায়ে কঠিন ধরা,
বনেরে শ্যামল করি, ফুলেরে ফুটায়ে ত্বরা,
সারাপ্রাণ ঢালি দিয়া,
জুড়ায়ে জগৎ-হিয়া,
আমার প্রাণের মাঝে কে আসিবি আয় তোরা।”
আমি যাব—আমি যাব—কোথায় সে, কোন্ দেশ—
জগতে ঢালিব প্রাণ,
গাহিব করুণা-গান;
উদ্বেগ-অধীর হিয়া
সুদূর সমুদ্রে গিয়া
সে প্রাণ মিশাব, আর সে গান করিব শেষ।
ওরে চারিদিকে মোর
এ কি কারাগার ঘোর!
ভাঙ্ ভাঙ্ ভাঙ্ কারা, আঘাতে আঘাত কর্!
ওরে আজ কি গান গেয়েছে পার্থী,
এয়েছে রবির কর।

04চিত্ত যেথা ভয়শূন্যকাব্যগ্রন্থ: নৈবেদ্য

মূল বাংলা

চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,
জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর
আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী
বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি,
যেথা বাক্য হৃদয়ের উৎসমুখ হতে
উচ্ছ্বসিয়া উঠে, যেথা নির্বারিত স্রোতে
দেশে দেশে দিশে দিশে কর্মধারা ধায়
অজস্র সহস্রবিধ চরিতার্থতায়—

যেথা তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশি
বিচারের স্রোতঃপথ ফেলে নাই গ্রাসি,
পৌরুষেরে করে নি শতধা; নিত্য যেথা
তুমি সর্ব কর্ম চিন্তা আনন্দের নেতা—

নিজ হস্তে নির্দয় আঘাত করি, পিতঃ,
ভারতেরে সেই স্বর্গে করো জাগরিত।

Tagore’s own English version · Gitanjali 35 (1912)

Where the mind is without fear and the head is held high;
Where knowledge is free;
Where the world has not been broken up into fragments by narrow domestic walls;
Where words come out from the depth of truth;
Where tireless striving stretches its arms towards perfection;
Where the clear stream of reason has not lost its way into the dreary desert sand of dead habit;
Where the mind is led forward by thee into ever-widening thought and action—
Into that heaven of freedom, my Father, let my country awake.

05১৪০০ সালসঞ্চয়িতা থেকে

মূল বাংলা

আজি হতে শতবর্ষ পরে
কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি
কৌতূহলভরে,
আজি হতে শতবর্ষ পরে!
আজি নব বসন্তের প্রভাতের আনন্দের
লেশমাত্র ভাগ,
আজিকার কোনো ফুল, বিহঙ্গের কোনো গান,
আজিকার কোনো রক্তরাগ—

অনুরাগে সিক্ত করি পারিব কি পাঠাইতে
তোমাদের করে,
আজি হতে শতবর্ষ পরে?

তবু তুমি একবার খুলিয়া দক্ষিণদ্বার
বসি বাতায়নে
সুদূর দিগস্তে চাহি কল্পনায় অবগাহি
ভেবে দেখো মনে—
একদিন শতবর্ষ আগে
চঞ্চল পুলকরাশি কোন্ স্বর্গ হতে ভাসি
নিখিলের মর্মে আসি লাগে,
নবীন ফাল্গুনদিন সকল-বন্ধন-হীন
উন্মত্ত অধীর,
উড়ায়ে চঞ্চল পাখা পুষ্পরেণুগন্ধমাখা
দক্ষিণসমীর
সহসা আসিয়া ত্বরা রাঙায়ে দিয়েছে ধরা
যৌবনের রাগে,
তোমাদের শতবর্ষ আগে।
সেদিন উতলা প্রাণে, হৃদয় মগন গানে,
কবি এক জাগে—
কত কথা পুষ্পপ্রায় বিকশি তুলিতে চায়
কত অনুরাগে,
একদিন শতবর্ষ আগে।

আজি হতে শতবর্ষ পরে
এখন করিছে গান সে কোন্ নূতন কবি
তোমাদের ঘরে!
আজিকার বসন্তের আনন্দ-অভিবাদন

পাঠায়ে দিলাম তাঁর করে।
আমার বসন্তগান তোমার বসন্তদিনে
ধ্বনিত হউক ক্ষণতরে—
হৃদয়স্পন্দনে তব, ভ্রমরগুঞ্জনে নব,
পল্লবমর্মরে
আজি হতে শতবর্ষ পরে।

07

কাজী নজরুল ইসলাম · Kazi Nazrul Islam

1899–1976 · Bengal · National Poet of Bangladesh

01বিদ্রোহীঅগ্নি-বীণা (১৯২২)

মূল বাংলা

বল বীর-
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি আমারি, নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রির!
বল বীর-
বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি,’
চন্দ্র সূর্য্য গ্রহ তারা ছাড়ি,’
ভূলোক দ্যুলোক গোলেক ভেদিয়া,
খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া
উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাতৃর!
মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!
বল বীর-
আমি চির-উন্নত শির!

আমি চিরদুর্দ্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস,
মহা- প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস,
আমি মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর!

আমি দুর্ববার,
আমি ভেঙে করি সব চূর-মার!
আমি অনিয়ম, উচ্ছৃঙ্খল,
আমি দলে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম-কানুন শৃঙ্খল!
আমি মানিনাকো কোন আইন,
আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভীম ভাসমান মা ইন্
আমি ধূৰ্জ্জটী, আনি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর,
আমি বিদ্রোহী আমি বিদ্রোহী-সূত বিশ্ব-বিধাতৃর!
বল বীর—
চির উন্নত মম শির!

আমি ঝঞ্ঝা, আমি ঘূর্ণি,
আমি পথ-সম্মুখে যাহা পাই যাই চূর্ণি’।
আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ,
আমি আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ!
আমি হাম্বীর, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল,
আমি চল-চঞ্চল, ঠমকি’ ছমকি’
পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি’
ফিং দিয়া দিই তিন দোল্!
আমি চপলা-চপল হিন্দোল।
আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন ষা,
করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পঞ্জা
আমি উন্মাদ আমি ঝঞ্ঝা!
আমি মহামারী, আমি ভীতি ধরিত্রীর।
আমি শাসন-ত্রাসন, সংহার আমি উষ্ণ চির-অধীর।

বল বীর—
আমি চির-উন্নত শির।

আমি চির-দুরন্ত দুর্ম্মদ,
আমি দুর্দ্দম, মম প্রাণের পেয়ালা হর্দ্দম্ হ্যায় হর্দ্দম ভর্পুর মদ।
আমি হোম-শিখা, আমি সাগ্নিক জমদগ্নি,
আমি যজ্ঞ, আমি পুরোহিত, আমি অগ্নি!
আমি সৃষ্টি, আমি ধ্বংস, আমি লোকালয়, আমি শ্মশান,
আমি অবসান, নিশাবসান!
আমি ইন্দ্রাণি-সূত হাতে-চাঁদ ভালে-সূর্য্য,
মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণ-তুর্য্য।
আমি কৃষ্ণ-কণ্ঠ, মন্থন-বিষ পিয়া ব্যথা-বারিধির!
আমি ব্যোমকেশ, ধরি’ বন্ধন-হারা ধারা গঙ্গোত্রীর।
বল বীর—
চির-উন্নত মম শির!

আমি সন্ন্যাসী, সুর-সৈনিক,
আমি যুবরাজ, মম রাজ-বেশ ম্লান গৈরিক!
আমি বেদূঈন, আমি চেঙ্গিস্,
আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ।
আমি বজ্র, আমি ঈশান বিষাণে ওঙ্কার,
আমি ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহা-হুঙ্কার,
আমি পিনাক-পাণির ডমরু ত্রিশূল, ধর্ম্মরাজের দণ্ড,
আমি চক্র, মহাশঙ্খ, আমি প্রণব-নাদ প্রচণ্ড!
আমি ক্ষ্যাপা দুর্ব্বাসা-বিশ্বামিত্র-শিষ্য,
আমি দাবানল-দাহ, দাহন করিব বিশ্ব!

আমি প্রাণ-খোলা হাসি উল্লাস,—আমি সৃষ্টি-বৈরী মহাত্রাস,
আমি মহা-প্রলয়ের দ্বাদশ রবির রাহু-গ্রাস!
আমি কভু প্ৰশান্ত,—কভু অশান্ত দারুণ স্বেচ্ছাচারী,
আমি অরুণ খুনের তরুণ, আমি বিধির দর্প-হারী!
আমি প্রভঞ্জনের উচ্ছ্বাস, আমি বারিধির মহাকল্লোল,
আমি উজ্জ্বল, আমি প্রোজ্জ্বল,
আমি উচ্ছল জল-ছল-ছল, চল-উর্ম্মির হিন্দোল্-দোল্!—

আমি বন্ধন-হারা কুমারীর বেণী, তন্বি-নয়নে বহ্নি,
আমি ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ প্রেম-উদ্দাম, আমি ধন্যি!
আমি উন্মন মন উদাসীর,
আমি বিধবার বুকে ক্রন্দন শ্বাস, হা-হুতাশ আমি হুতাশীর!
আমি বঞ্চিত ব্যথা পথবাসী চির-গৃহহারা যত পথিকের,
আমি অবমানিতের মরম-বেদনা, বিষ-জ্বালা, প্রিয়-লাঞ্ছিত বুকে গতি ফের
আমি অভিমানী চির-ক্ষুব্ধ হিয়ার কাতরতা, ব্যথা সুনিবিড়,
চিত- চুম্বন-চোর-কম্পন আমি থর-থর-থর প্রথম পরশ কুমারীর!
আমি গোপন-প্রিয়ার চকিত চাহনী, ছল-ক’রে-দেখা-অনুখণ,
আমি চপল মেয়ের ভালোবাসা, তা’র কাঁকন চুড়ির কন-কন্।
আমি চির-শিশু, চির-কিশোর,
আমি যৌবন-ভীতু পল্লীবালার আঁচর কাঁচলি নিচোর!
আমি উত্তরী-বায়ু, মলয়-অনিল, উদাস পূরবী হাওয়া,
আমি পথিক-কবির গভীর রাগিণী, বেণু-বীণে গান গাওয়া।
আমি আকুল নিদাঘ-তিয়াষা, আমি রৌদ্র-রুদ্র রবি,
আমি মরু-নির্ঝর ঝর-ঝর, আমি শ্যামলিমা ছায়া-ছবি।

আমি তুরীয়ানন্দে ছুটে চলি এ কি উন্মাদ, আমি উন্মাদ!
আমি সহসা আমারে চিনেছি, আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ!
আমি উত্থান, আমি পতন, আমি অচেতন-চিতে চেতন,
আমি বিশ্ব-তোরণে বৈজয়ন্তী, মানব-বিজয়-কেতন,
ছুটি ঝড়ের মতন করতালি দিয়া,
হাসি’ হা-হা হা-হা হি-হি-হি-হি,
তাজি বোর্রাক্ আর উচ্চৈঃশ্রবা বাহন আমার
হাঁকে চিঁ-হিঁ-হিঁ-হিঁ চিঁ-হিঁ-হিঁ-হিঁ !
আমি বসুধা-বক্ষে আগ্নেয়াদ্রি, বাড়ব-বহ্নি, কালানল,
আমি পাতালে মাতাল অগ্নি-পাথার-কলরোল-কল-কোলাহল !
আমি তড়িতে চড়িয়া উড়ে চলি জোর-তুড়ি দিয়া, দিয়া লম্ফ,
আমি ত্রাস সঞ্চারি ভুবনে সহসা সঞ্চারি’ ভূমিকম্প !
ধরি বাসুকির ফণা জাপটি’,
ধরি স্বর্গীয় দূত জিব্রাইলের আগুনের পাখা সাপটি’ !
আমি দেব-শিশু, আমি চঞ্চল,
আমি ধৃষ্ট, আমি দাঁত দিয়া ছিড়ি বিশ্ব-মায়ের অঞ্চল !
আমি অর্ফিয়াসের বাঁশরী,
মহা- সিন্ধু উতলা ঘুম-ঘুম,
ঘুম চুমু দিয়ে করে নিখিল বিশ্বে নিঝ্ঝুম
মম বাঁশরীর তানে পাশরি’!
আমি শ্যামের হাতের বাঁশরী।
আমি রুষে উঠে’ যবে ছুটি মহাকাশ ছাপিয়া,
’ভয়ে সপ্ত নরক, হারিয়া দোজখ নিভে নিভে যায় কাঁপিয়া!
আমি বিদ্রোহ-বাহী নিখিল অধিল ব্যাপিয়া।
আমি শ্রাবণ-প্লাবন বন্যা,
কভু ধরণীরে করি বরণীয়া, কভু ৰিপুল ধ্বংস-ধন্যা।—
আমি ছিনিয়া আনিব বিষ্ণু-বক্ষ হইতে যুগল কন্যা!

আমি অন্যায়, আমি উল্কা, আমি শনি,
আমি ধূমকেতু-জ্বালা, বিষধর কাল-ফণি!
আমি ছিন্নমস্তা চণ্ডী, আমি রণদা সর্ব্বনাশী,
আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি!

আমি মৃন্ময়, আমি চিন্ময়,
আমি অজর অমর অক্ষয়, আমি অব্যয়!
আমি মানব দানব দেবতার ভয়,
বিশ্বের আমি চির-দুর্জ্জয়,
জগদীশ্বর-ঈশ্বর আমি পুরুষোত্তম সত্য,
আমি তাথিয়া তাথিয়া মথিয়া ফিরি এ স্বর্গ পাতাল মর্ত্ত্য!
আমি উন্মাদ আমি উন্মাদ!!
আমি চিনেছি আমারে, আজিকে আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ!!—
আমি উত্তাল, আমি তুঙ্গ, ভয়াল, মহাকাল,
আমি বিবসন, আজ ধরাতল নভঃ ছেয়েছে আমারি জটাজাল!
আমি ধন্য! আমি ধন্য!!
আমি মুক্ত, আমি সত্য, আমি বীর বিদ্রোহী সৈন্য
আমি ধন্য! আমি ধন্য!!

আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার,
নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব, আনিব শান্তি শান্ত উদার !
আমি হল বলরাম-স্কন্ধে,
আমি উপাড়ি’ ফেলিব অধীন বিশ্ব অবহেলে নব-সৃষ্টির মহানন্দে।
মহা- বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত,

যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না,
বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত!
আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন,
আমি স্রষ্টা-সূদন, শোক-তাপ-হানা খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন!
আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দোবো পদচিহ্ণ!
আমি খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন!!
আমি চির-বিদ্রোহী বীর—
আমি বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি এবং চির-উন্নত শির!!

02প্রলয়োল্লাসঅগ্নি-বীণা (১৯২২)

মূল বাংলা

তোরা সব জয়ধ্বনি কর্।
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!
ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল্-বোশেখীর ঝড়।
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্।
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!

আসছে এবার অনাগত প্রলয়-নেশার নৃত্য-পাগল
সিন্ধু-পারের সিংহ-দ্বারে ধমক হেনে ভাঙল আগল!
মৃত্যু-গহন অন্ধ-কূপে
মহাকালের চণ্ড-রূপে
ধূম্র ধূপে
বজ্র শিখার মশাল জেলে আস্ছে ভয়ঙ্কর—
ওরে ঐ হাস্ছে ভয়ঙ্কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!

ঝামর তাহার কেশের দোলার ঝাপ্টা মেরে গগন দুলায়
সর্ব্বনাশী জ্বালা-মুখী ধূমকেতু তার চামর ঢুলায়!
বিশ্বপাতার বক্ষ-কোলে
রক্ত তাহার কৃপাণ ঝোলে
দোদুল দোলে!
অট্টরোলের হট্টগোলে স্তব্ধ চরাচর—
ওরে ঐ স্তব্ধ চরাচর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!

দ্বাদশ রবির বহ্নি-জ্বালা ভয়াল তাহার নয়ন কটায়,
দিগন্তরের কাঁদন লুটায় পিঙ্গল তার ত্রস্ত জটায়!
বিন্দু তাহার নয়ন-জলে
সপ্ত মহাসিন্ধু দোলে
কপোল-তলে!
বিশ্ব-মায়ের আসন তারি বিপুল বাহুর পর—
হাঁকে ঐ “জয় প্রলয়ঙ্কর!”
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!

মাভৈঃ মাভৈঃ! জগৎ জুড়ে প্রলয় এবার ঘনিয়ে আসে
জরায়-মরা মুমূর্ষুদের প্রাণ লুকানো ঐ বিনাশে!
এবার মহা-নিশার শেষে
আস্বে উষা অরুণ হেসে
করুণ বেশে!

দিগম্বরের জটায় হাসে শিশু চাঁদের কর—
আলো তার ভর্বে এবার ঘর।
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্।
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!

ঐ সে মহাকাল-সারথি রক্ত-তড়িত-চাবুক হানে,
রণিয়ে ওঠে হ্রেষার কাঁদন বজ-গানে ঝড়-তুফানে!
ক্ষুরের দাপট তারায় লেগে উল্কা ছুটায় নীল খিলানে!
গগন-তলের নীল খিলানে।
অন্ধ কারার বন্ধ কূপে
দেবতা বাঁধা যজ্ঞ-যুপে
পাষাণ-স্তূপে!
এই তো রে তার আসার সময় ঐ রথ-ঘর্ঘর—
শোনা যায় ঐ রথ-ঘর্ঘর।
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!

ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর?—প্রলয় নূতন সৃজন-বেদন!
আসছে নবীন, জীবন-হারা অ-সুন্দরে কর্তে ছেদন!
তাই সে এমন কেশে বেশে
প্রলয় বয়েও আস্ছে হেসে—
মধুর হেসে!
ভেঙে আবার গড়তে জানে সে চির-সুন্দর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!

ঐ ভাঙা-গড়া খেলা যে তার কিসের তবে ডর?
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!—
বধূরা প্রদীপ তুলে ধর্!
কাল ভয়ঙ্করের বেশে এবার ঐ আসে সুন্দর!—
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!

03খেয়া-পারের তরণীঅগ্নি-বীণা (১৯২২)

মূল বাংলা

যাত্রীরা রাত্তিরে হ’তে এল খেয়া পার,
বজ্রেরি তূর্য্যে গর্জ্জেছে কে আবার?
প্রলয়েরি আহ্বান ধ্বনিল কে বিষাণে!
ঝঞ্ঝা ও ঘন দেয়া স্বনিল রে ঈশানে!

নাচে পাপ-সিন্ধুতে তুঙ্গ তরঙ্গ,
মৃত্যুর মহানিশা রুদ্র উলঙ্গ,
নিঃশেষে নিশাচর গ্রাসে মহাবিশ্বে,
ত্রাসে কাঁপে তরণীর পাপী যত নিঃস্বে।

তমসাবৃতা ঘোরা ‘কিয়ামত্’ রাত্রি,
খেয়া-পারে আশা নাই ডুবিল রে যাত্রী!
দমকি দমকি দেয়া হাঁকে কাঁপে দামিনী,
শিঙ্গার হুঙ্কারে থর থর যামিনী।

লঙ্ঘি এ সিন্ধুরে প্রলয়ের নৃত্যে
ওগো কার তরী ধায় নির্ভীক চিত্তে,
অবহেলি’ জলধির ভৈরব গর্জ্জন
প্রলয়ের ডঙ্কার ওঙ্কার তর্জ্জন?

পুণ্য-পথের এ যে যাত্রীরা নিষ্পাপ,
ধর্ম্মেরি বর্ম্মে সু-রক্ষিত দিল্ সাফ্,
নহে এরা শঙ্কিত বজ্র-নিপাতেও
কাণ্ডারী আহ্মদ তরী ভরা পাথেয়।

আবুবকর্ উস্মান উমর্ আলী হায়দর
দাঁড়ী যে এ তরণীর, নাই ওরে নাই ভর!
কাণ্ডারী এ তরীর পাকা মাঝি মাল্লা,
দাঁড়ি-মুখে সারি-গান_লা শরীক আল্লাহ্

‘শাফায়ত্’-পাল-বাঁধা তরণীর মাস্তুল,
‘জান্নাত্’ হ’তে ফেলে হুরী রাশ্ রাশ্ ফুল।
শিরে নত স্নেহ-আঁখি মঙ্গল-দাতৃ,
গাও জোরে সারি-গান ও-পারের যাত্রী।

বৃথা ত্রাসে প্রলয়ের সিন্ধু ও দেয়া ভার,
ঐ হ’লো পুণ্যের যাত্রীরা খেয়া পার৷

04কোরবাণীঅগ্নি-বীণা (১৯২২)

মূল বাংলা

ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদ্-বোধন!
দুর্ব্বল ভীরু চুপ রহো, ওহো খাম্খা ক্ষুব্ধ মন!
ধ্বনি ওঠে রণি’ দূর বাণীর,—
আজিকার এ-খুন কোর্বানীর্,
দুম্বা-শির রুম্বাসীর
শহীদের শির-সেরা আজি—রহমান কি রুদ্র নন?
বাস্! চুপ্ খামোশ রোদন!
আজ শোর ওঠে জোর “খুন দে, জান দে শির দে বৎস শোন্!”
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদ্-বোধন!

ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন!
খঞ্জর মারো গর্দ্দানেই,
পঞ্জরে আজি দর্দ নেই,
মর্দ্দানী’ই পর্দ্দা নেই,
ডর্তা নেই আজ খুন্-খারাবীতে রক্ত-লুব্ধ মন!
খুনে খেলবো খুন্-মাতন!
দুনো উন্মাদনাতে সত্য মুক্তি আন্তে যুঝ্বো রণ।
ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন!

ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন!
চ’ড়েছে খুন্ আজ খুনিয়ারার,
মুস্লিমে সারা দুনিয়াটার,
‘জুল্ফেকার’ খুল্বে তার
দু’ধারী ধার্ শেরে-খোদার রক্তে পূত বদন!
খুনে আজকে রুধ্বো মন!
ওরে শক্তি-হস্তে মুক্তি, শক্তি রক্তে সুপ্ত শোন্।
ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন!

ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন!
আস্তানা সিধা রাস্তা নয়,
‘আজাদী’ মেলে না পস্তানোয়,
দস্তা নয় সে সস্তা নয়।
হত্যা নয় কি মৃত্যুও? তবে রক্ত-লুব্ধ কোন্
কাঁদে, শক্তি-দুঃস্থ শোন্—
“এয়্ ইব্রাহীম্ আজ কোর্বানী কর্ শ্রেষ্ঠ পুত্রধন!”
ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন!

ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন!
এ’ তো নহে লোহু তরবারের
ঘাতক জালিম জোর্বারের,
কোরবানের জোর-জানের
খুন এ যে, এতে গোর্দ্দা ঢের রে, এ ত্যাগে ‘বুদ্ধ’ মন!
এতে মা রাখে পুত্র-পণ!
ভাই জননী হাজেরা বেটারে পরালো বলির পূত বসন!
ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন!

ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন!
এই দিনেই ‘মীনা’-ময়দানে
পুত্র-স্নেহের গর্দ্দানে
ছুরি হেনে’ খুন্ ক্ষরিয়ে নে’
রেখেছে আব্বা ইব্রাহীম্ সে আপ্না রুদ্র পণ!
ছি ছি! কেঁপো না ক্ষুদ্র মন!
আজ জল্লাদ নয়, প্রহ্লাদসম মোল্লা খুন-বদন!
ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন!

ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন!
দ্যাখ্ কেঁপেছে ‘আরশ’ আস্মানে,
মন্-খুনী কি রে রাশ মানে?
ত্রাস প্রাণে?—তবে রাস্তা নে!
প্রলয়-বিষাণ ‘কিয়ামতে’ তবে বাজাবে কোন্ বোধন?
সে কি সৃষ্টি সংশোধন?
ওরে তাথিয়া তাথিয়া নাচে ভৈরব বাজে ডম্বরু শোন্!—
ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন!

ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন!
মুস্লিম-রণ-ডঙ্কা সে,
খুন্ দেখে করে শঙ্কা কে?
টঙ্কারে অসি ঝঙ্কারে
ওরে হুঙ্কারে ভাঙি গড়া-ভীম-কারা ল’ড়বো রণ-মরণ!
ঢালে বাজ্বে ঝন-ঝনন্!
ওরে সত্য মুক্তি স্বাধীনতা দেবে এই সে খুন-মোচন!
ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন!

ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন!
জোর চাই, আর যাচ্না নয়,
কোরবাণী-দিন আজ না ওই?
বাজ্না কই? সাজ্না কই?
কাজ না আজিকে জান্ মাল দিয়ে মুক্তির উদ্ধরণ?
বল্—“যুঝবো জান্ ভি পণ!”
ঐ খুনের খুঁটীতে কল্যাণ-কেতু, লক্ষ্য ঐ তোরণ!
আজ আল্লার নামে জান্ কোরবানে ঈদের পূত বোধন!
ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন!

05শাত্-ইল-আরবঅগ্নি-বীণা (১৯২২)

মূল বাংলা

শাতিল্-আরব! শাতিল্-আরব!! পূত যুগে যুগে তোমার তীর।
শহীদের লোহু, দিলীরের খুন ঢেলেছে যেখানে আরব-বীর।
যুঝেছে এখানে তুর্ক-সেনানী,
য়ূনানী, মেস্রী, আর্বী কেনানী;—
লুটেছে এখানে মুক্ত আজাদ্ বেদূঈন্দের চাঙ্গা শির!
নাঙ্গা-শির্,
শম্শের হাতে, আঁশু-আঁখে হেথা মূর্ত্তি দেখেছি বীর-নারীর!
শাতিল্-আরব! শাতিল্-আরব!! পূত যুগে যুগে তোমার তীর।

‘কূত-আমারা’র রক্তে ভরিয়া
দজ্লা এনেছে লোহুর দরিয়া;
উগারি’ সে খুন তোমাতে দজ্লা নাচে ভৈরব ‘মস্তানী’র।
ত্রস্তা-নীর
গর্জ্জে রক্ত-গঙ্গা ফোরাত,—“শাস্তি দিয়েছি গোস্তাখীর!”
দজ্লা-ফোরাত-বাহিনী শাতিল! পূত যুগে যুগে তোমার তীর।

বহায়ে তোমার লোহিত বন্যা
ইরাক আজমে করেছ ধন্যা;—
বীর-প্রসূ দেশ হ’ল বরেণ্যা মরিয়া মরণ মর্দ্দমীর!
মর্দ্দ বীর

সাহারায় এরা ধুঁকে’ মরে তবু পরে না শিকল পদ্ধতির।
শাতিল্-আরব! শাতিল্-আরব!! পূত যুগে যুগে তোমার তীর

দুষ্মন্-লোহু ঈর্ষায় নীল
তব তরঙ্গে করে ঝিল্-মিল্!
বাঁকে বাঁকে রোষে মোচড় খেয়েছে গিয়ে নীল খুন পিণ্ডারীর!
জিন্দা বীর
‘জুল্ফিকার’ আর ‘হায়দরী’ হাঁক হেথা আজো হজরত্ আলীর—
শাতিল্-আরব! শাতিল্-আরব!! জিন্দা রেখেছে তোমার তীর!

ললাটে তোমার ভাস্বর টীকা
বস্রা-গুলের বহ্নিতে লিখা,—
এ যে বসোরার খুন-খারাবী গো রক্ত-গোলাব-মঞ্জরীর!
খঞ্জরীর
খঞ্জরে ঝরে খর্জ্জুর দম হেথা লাখো দেশ-ভক্ত-শির!
শাতিল্-আরব! শাতিল্-আরব!! পূত যুগে যুগে তোমার তীর!

ইরাক-বাহিনী! এ যে গো কাহিনী,—
কে জানিত কবে বঙ্গ-বাহিনী
তোমারও দুঃখে “জননী আমার!” বলিয়া ফেলিবে তপ্ত নীর?—
রক্ত-ক্ষীর—
পরাধীনা! একই ব্যথায় ব্যথিত ঢালিল দু-ফোঁটা ভক্ত-বীর।
শহীদের দেশ! বিদায়! বিদায়!! এ অভাগা আজি নোয়ায় শির!

English texts follow standard public-domain editions. The Bangla translations were made for this website. Original Bangla texts of Tagore and Nazrul are from Bengali Wikisource.